রিপোর্ট: মাহবুব হোসাইন
২8 ফেব্রুয়ারি ২০২৫, শনিবার

উত্তপ্ত বিতর্ক:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে এক উত্তপ্ত বৈঠক হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে তারা একে অপরের সাথে বারবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। আলোচনাটি মূলত একটি খনিজ সম্পদ চুক্তির বিষয়ে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটি তীব্র মতপার্থক্যের কারণে অসম্পন্ন থেকে যায়।
বৈঠকের পটভূমি: কী ঘটেছিল?
প্রথম থেকেই এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল, কারণ এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি খনিজ সম্পদ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের একটি বড় অংশ আমেরিকার কাছে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারত।
তবে বৈঠকের শুরুতেই ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে মতপার্থক্য প্রকট হয়ে ওঠে। জেলেনস্কি তার বক্তব্যে বলেন যে রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনা করার কোনও অবকাশ নেই এবং কোনও আপসের প্রশ্নই আসে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে পুতিনের সঙ্গে সমঝোতা করা মানেই ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
এরপরই ট্রাম্প তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আপনাকে শান্তি চুক্তি করতেই হবে, নাহলে আমরা সরে যাব।” তিনি ইউক্রেনের জন্য মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তার পরিমাণ তুলে ধরে বলেন, “আপনি যদি আমাদের সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করেন এবং কোনও কৌশলগত পরিকল্পনা না নেন, তবে আপনি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি নিচ্ছেন।”
প্রধান বিতর্ক: কী নিয়ে তর্ক হয়েছিল?
জেলেনস্কির যুক্তি
১. শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নেই: জেলেনস্কির মতে, রাশিয়ার সাথে কোনও আপস করা সম্ভব নয়, কারণ ২০১৯ সালের যুদ্ধবিরতির চুক্তি ব্যর্থ হয়েছে। সেই সময় মস্কো পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধাদের সমর্থন দিয়েছিল, কিন্তু তারপরও ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালিয়েছে।
২. ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব: তিনি যুক্তি দেন যে রাশিয়ার সাথে আপস করলে ইউক্রেনের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।
৩. মার্কিন সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা: তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রতি আহ্বান জানান যে, তারা যেন ইউক্রেনকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সমর্থন চালিয়ে যায়।
ট্রাম্পের অবস্থান
১. শান্তির জন্য আপস দরকার: ট্রাম্পের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়ারই সুবিধা হবে। তিনি মনে করেন, ইউক্রেনের উচিত রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা।
২. মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ: ট্রাম্প যুক্তি দেন যে আমেরিকা ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু এর প্রতিদানে আমেরিকাকে পর্যাপ্ত কিছু দেয়া হয়নি।
৩. তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি: ট্রাম্প বলেন যে এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এটি আন্তর্জাতিকভাবে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে, যা আমেরিকাসহ সারা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বৈঠকের শেষ ও প্রতিক্রিয়া
বৈঠকের উত্তপ্ত বিতর্কের পর পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে জেলেনস্কিকে চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই সরে যেতে বলা হয়। তিনি হোয়াইট হাউস ছেড়ে চলে যান, যা বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অনেক আগেই ঘটে।
এরপর ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম “ট্রুথ সোশ্যাল”-এ লেখেন, “জেলেনস্কি ওভাল অফিসে আমেরিকার প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন। তিনি যদি আমাদের উপস্থিতি দিয়ে নিজের সুবিধা আদায় করতে চান, তবে আমি সেই সুযোগ দিতে রাজি নই। আমি যুদ্ধ চাই না, আমি শান্তি চাই।”
প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিফলন
মার্কিন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
- রিপাবলিকান প্রতিক্রিয়া: সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, “জেলেনস্কি এতটাই অহংকারী আচরণ করেছেন যে আমি মনে করি না আমরা তার সাথে ব্যবসা করতে পারব।”
- ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া: প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, “এই ঘটনাটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এটি শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়, গোটা পশ্চিমা জোটের জন্যও ক্ষতিকর। এটি পুতিনকে আরও উৎসাহিত করবে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
- যুক্তরাজ্য: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টার্মার বলেন, “আমরা ইউক্রেনের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত রাখব এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজতে সাহায্য করব।”
- জার্মানি: জার্মানির সম্ভাব্য পরবর্তী চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেন, “আমাদের কখনও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এই যুদ্ধের আক্রমণকারী কে এবং শিকার কে। আমরা ইউক্রেনের পাশে থাকব।”
- রাশিয়া: রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্যঙ্গ করে বলেন, “এটি অলৌকিক ঘটনা যে ট্রাম্প ও ভ্যান্স জেলেনস্কিকে আঘাত করেননি!”
ভবিষ্যৎ প্রভাব: কী হতে পারে?
এই বৈঠকের পর মার্কিন-ইউক্রেন সম্পর্ক নতুন এক অনিশ্চিত পর্বে প্রবেশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে কয়েকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে—
১. আমেরিকার ইউক্রেন সমর্থন কমতে পারে: ট্রাম্প যদি তার নীতি পরিবর্তন না করেন, তবে ভবিষ্যতে ইউক্রেন কম সামরিক সহায়তা পেতে পারে।
২. ইউরোপের দায়িত্ব বাড়তে পারে: যদি মার্কিন সমর্থন কমে, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর উপর ইউক্রেনের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
৩. রাশিয়ার সুবিধা: যদি পশ্চিমা ঐক্য দুর্বল হয়, তবে রাশিয়া এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী হতে পারে
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-জেলেনস্কির এই দ্বন্দ্ব শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধ-শান্তি কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। ইউক্রেন কি তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে পারবে? নাকি ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল পরিবর্তন হবে? এই উত্তপ্ত বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোন পথে এগোবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
