জামিল আহমেদ, লন্ডন থেকে

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ২৩ মার্চ ২০২৫, রবিবার ভোরে বিশ্বনাথ পৌরসভার রামপাশা রোডের রোজিস টাওয়ারে এক ফ্ল্যাট থেকে আবদুল মুকিত (৩৫) নামের যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি পৌরসভার দক্ষিণ মিরেরচর (মোল্লাবাড়ি) গ্রামের আবদুশ শহিদের ছেলে এবং দীর্ঘদিন ধরে পৌর এলাকায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। পাশাপাশি ওই টাওয়ারে অবস্থানরত তার বোনের ফ্ল্যাটের দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করতেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ঘটনার আগের রাতে মুকিত আর বাড়ি ফেরেননি। রাতভর তার খোঁজখবর করা হয় কিন্তু কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে সেহরির সময় রোজিস টাওয়ারের নিরাপত্তা প্রহরী জানান, মুকিতের বোনের ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলছে না। এতে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে দেখেন, ফ্ল্যাটের প্রধান দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ, তবে পাশে একটি জানালার গ্লাস খোলা রয়েছে। সেই জানালার ফাঁক দিয়ে কেউ একজন ভেতরে প্রবেশ করে দরজা খুললে ফ্ল্যাটের ভেতর মুকিতের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।
এই ঘটনায় বেশ কিছু অস্বাভাবিক দিক লক্ষ করা গেছে যা আত্মহত্যার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রথমত, মৃতদেহে আত্মহত্যার সাধারণ চিত্রের চেয়ে ভিন্নতা ছিল। মুকিতের দুটি পা রশি দিয়ে বাঁধা ছিল, যা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব বা অস্বাভাবিক বিষয়। দ্বিতীয়ত, তার পেট এবং পায়ে বেশ কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন ছিল। এসব শারীরিক ক্ষত এবং অবস্থান দেখে প্রাথমিকভাবে অনেকেই সন্দেহ করছেন এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে, যা আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশ্বনাথ থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানান, পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা মনে হলেও, মরদেহের পায়ে বাঁধা রশি ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন রহস্যের সৃষ্টি করছে। আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। রিপোর্টের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে।”
অপরদিকে, নিহত মুকিতের পরিবারের দাবি, এটি নিছক আত্মহত্যা নয়, বরং এটি একটি ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত হত্যা। তারা জানান, মুকিতের কোনো মানসিক সমস্যা ছিল না, এবং তার আচরণ বা কথাবার্তায়ও কখনো আত্মহত্যার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ এবং পরিবারের দায়িত্বশীল একজন সদস্য।
পরিবারের পক্ষ থেকে বিশ্বনাথ থানায় একটি অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। ওসি এনামুল হক আরও জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে রোজিস টাওয়ারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং মুকিতের পরিচিতজনদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ।
এই রহস্যময় মৃত্যুর পেছনে কি পারিবারিক বা পেশাগত কোনো বিরোধ ছিল? নাকি এটি প্রেমঘটিত কোনো ইস্যু ছিল? এসব প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ডিজিটাল প্রমাণ এবং পুলিশি তদন্তই এখন এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের একমাত্র পথ।
এদিকে, এলাকাবাসীর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা ঘিরে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। অনেকে দোষীদের দ্রুত খুঁজে বের করে বিচার দাবিও জানিয়েছেন। সিলেটের মতো একটি শান্তিপূর্ণ এলাকায় এমন একটি ঘটনার পেছনের আসল সত্য জানতে এখন সবাই অপেক্ষায় রয়েছেন।
