লিখেছেন: ওমর মেহেদী রুনু, সান্ডারল্যান্ড
৩ মার্চ ২০২৫

রমজান এলেই মুসলিমদের মধ্যে এক অন্যরকম ভাবাবেগ তৈরি হয়। এটি শুধু উপবাসের মাস নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা, দান-সদকা, এবং আল্লাহর রহমত লাভের জন্য বিশেষ সময়। রমজানের প্রথম দশ দিনকে বলা হয় “রহমতের দশক”। এই সময় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অফুরন্ত দয়া বর্ষণ করেন, আর যারা আন্তরিকভাবে ইবাদত করেন, তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের আশায় থাকেন।
এই দশ দিন আত্মজিজ্ঞাসার সময়। সারাবছর আমরা বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যে থাকি, গুনাহ করি, ভুল করি, অনেক সময় অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণও করে ফেলি। কিন্তু রমজান এমন একটি সময় যখন আমরা এসব ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাই। আল্লাহ বলেন, “আমার রহমত আমার ক্রোধকে অতিক্রম করে গেছে।” অর্থাৎ, তাঁর দয়া এতটাই ব্যাপক যে, কেউ যদি সত্যিকারের অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে তিনি ক্ষমা করে দেন।
অনেকেই এই সময়ে বেশি বেশি নামাজ আদায় করেন, কুরআন তিলাওয়াত করেন, এবং ইস্তিগফার করেন। কারণ, এই দশক হলো সেই সময় যখন আল্লাহর রহমত বেশি প্রবাহিত হয়। রাতের শেষ ভাগে উঠে দু’রাকাত তাহাজ্জুদ পড়া, নিজের পাপের জন্য কান্নাকাটি করা, বেশি বেশি দোয়া করা—এসব ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন।
তবে রহমতের দশ দিন শুধু নামাজ-রোজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দান-সদকারও সময়। রাসূল (সা.) বলেছিলেন, “দান-সদকা গুনাহকে নিঃশেষ করে দেয়, যেমনভাবে পানি আগুন নেভায়।” রমজানে দান করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটি শুধু দরিদ্রদের সাহায্য করা নয়, বরং নিজের পাপ মোচনেরও উপায়। যারা ধনী, তারা গরিবদের ইফতার করান, যাকাত প্রদান করেন, ফিতরা দেন, এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেন। অনেক মানুষ এই মাসে মসজিদে দান করেন, এতিমদের খাওয়ান, বা এমন কাউকে সহায়তা করেন যিনি মুখ ফুটে চাইতেও পারেন না।

রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষমা। শুধু আল্লাহর কাছে নয়, আমাদের একে অপরের প্রতিও ক্ষমাশীল হওয়া উচিত। আমরা প্রায়শই পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ি। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যদি আমরা আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা চাই, তাহলে আমাদেরও অন্যদের ক্ষমা করতে হবে। অনেক সময় অহংকার বা রাগের কারণে আমরা ক্ষমা চাইতে পারি না বা অন্যদের ক্ষমা করতে পারি না। কিন্তু রমজানের রহমতের বার্তা হলো—ক্ষমা করো, ক্ষমা পাও।
এই দশ দিনে অনেকেই আত্মশুদ্ধির সংকল্প গ্রহণ করেন। রমজানের আগমন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত নানা পাপের মধ্যে লিপ্ত হচ্ছি, কিন্তু কতটুকু অনুতপ্ত হচ্ছি? এই মাস আমাদের বলে, পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করো না, আজ থেকেই শুরু করো। যারা মিথ্যা বলেন, যারা সুদ-ঘুষের মধ্যে আছেন, যারা অন্যকে কষ্ট দেন, তাদের জন্য এই মাসই সেই সময়, যখন তারা নিজেদের শোধরাতে পারেন।
রমজানের রহমতের দশ দিন তাই শুধু রোজা রাখার জন্য নয়, বরং নিজের ভেতরের মানুষটাকে বদলে দেওয়ার জন্য। এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো উচিত—ইবাদতে, দানে, ক্ষমায়, এবং নিজেকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায়। যদি সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলে শুধু এই দশ দিন নয়, সারা বছরই আমাদের জীবনে রহমত বইতে থাকবে।
