লিখেছেন: মোহাম্মদ ইকবাল
সম্পাদক, খবর কেন্দ্র
তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, শুক্রবার

রমজান মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস বা রোজা পালন কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলনই নয়, এর রয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত স্বাস্থ্য উপকারিতা। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিয়মিত রোজা রাখার মাধ্যমে আমাদের শরীরে কোষীয় পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। নিচে রোজার কিছু কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপকারিতা তুলে ধরা হলো।
১. অটোফ্যাজি ও কোষ পুনর্জন্ম
রোজার অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রভাব হলো অটোফ্যাজি নামক কোষীয় পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া সক্রিয় হওয়া। খাদ্য গ্রহণ বন্ধ থাকার কারণে কোষগুলো সাময়িক “ক্ষুধার্ত” অবস্থায় যায় এবং তখন তারা নিজেরই পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত উপাদানগুলিকে ভেঙে পুনঃব্যবহার উপযোগী করে তোলে
এই আত্ম-পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ দেহ কোষসমূহের মধ্যে জমে থাকা “আবর্জনা” দূর হয় এবং কোষের কার্যকারিতা উন্নত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের পর পুনরায় খাদ্যগ্রহণ শুরু করলে এই অটোফ্যাজি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় স্টেম সেল সক্রিয় হয়ে নতুন কোষ উৎপাদনে সহায়তা করে, যা কোষের পুনর্জন্ম ও মেরামত প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে
ফলে রোজা শরীরের পুরনো, দুর্বল কোষ সরিয়ে ফেলে নতুন সজীব কোষ সৃষ্টির মাধ্যমে সামগ্রিক স্বাস্থ্য পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।
২. স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের উন্নতি
নিয়মিত রোজা পালন মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী প্রভাব বয়ে আনে। উপবাস অবস্থায় মস্তিষ্কে ব্রেইন-ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (BDNF) নামে একটি প্রোটিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা নতুন স্নায়ুকোষের সৃষ্টি (নিউরোজেনেসিস)促及 করে এবং শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করে
একই সাথে উপবাসকালীন কোষীয় “পরিষ্কার” প্রক্রিয়া অর্থাৎ অটোফ্যাজি মস্তিষ্কে সক্রিয় হওয়ার ফলে স্নায়ুকোষগুলোতে জমে থাকা ক্ষতিকর উপাদান অপসারিত হয় এবং মস্তিষ্ক বয়সজনিত স্নায়ুবিক ক্ষয় (যেমন আলঝেইমার) থেকে সুরক্ষা পেতে পারে
অনেকেই রোজা রাখার সময় মানসিক স্বচ্ছতা এবং স্থিরতা বেশি অনুভব করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উপবাসে মস্তিষ্কের স্নায়ু উদ্দীপনা ও সতর্কতা বৃদ্ধি পায় এবং অনেকেরই মন-মেজাজ উন্নত হয়ে এক ধরনের সুখানুভূতি সৃষ্টি হয়
এই মানসিক প্রশান্তি ও উৎফুল্লতা বৃদ্ধি রোজার আরেকটি সম্ভাব্য উপকার হিসাবে গবেষকরা বিবেচনা করছেন।
৩. জিন এক্সপ্রেশন পরিবর্তন
দীর্ঘ সময় উপবাস আমাদের জিনোমের কর্মকাণ্ডেও (gene expression) ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, সার্টুইন (Sirtuin) নামে দীর্ঘায়ু ও কোষ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কিছু জিনের উৎপাদন উপবাসের সময় বৃদ্ধি পায়
সIRT1 এবং SIRT3 এর মতো প্রোটিনগুলো কোষে ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়া ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন ও বিপাকীয় কার্যক্রম সুসমন্বিত রাখে, ফলে কোষের বার্ধক্যগত ক্ষতি ধীর হয়। একই সঙ্গে উপবাস DNA মেরামত এবং কোষ পুনর্গঠনকারী বিভিন্ন জিনকে সক্রিয় করে যা শরীরের দীর্ঘায়ুতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে যে টানা উপবাসের ফলে শরীরে এমন কিছু প্রোটিনের মাত্রা বাড়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত DNA ঠিক করার কাজ করে এবং কোষকে নানা চাপ থেকে রক্ষা করে। সব মিলিয়ে, রোজার মাধ্যমে কোষীয় স্তরে এমন কিছু পরিবর্তন হয় যা বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর করতে এবং সুস্থ দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
৪. দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্য প্রতিরোধ
ক্যালোরি সীমাবদ্ধতা (Caloric Restriction) প্রাণীর আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির জন্য সুপরিচিত একটি পদ্ধতি, এবং উপবাস অনেকটাই সেই প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করে শরীরে বার্ধক্য প্রতিরোধে কাজ করে।
বিভিন্ন প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে যে ধারাবাহিক উপবাসে জীবদ্দশা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এক পরীক্ষায় পর্যায়ক্রমিক উপবাসে ইঁদুরের গড় আয়ুষ্কাল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৮০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা অত্যন্ত চমকপ্রদ ফলাফল (অবশ্য সব গবেষণায় এত বেশি বৃদ্ধি দেখা যায়নি, তবে আয়ু কিছুটা হলেও বাড়ার প্রবণতা বারবার শনাক্ত হয়েছে)। মানবদের উপর সরাসরি এধরনের আয়ু-বৃদ্ধি পরিমাপ করা কঠিন, তবে কিছু পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা নিয়মিত দীর্ঘ সময় ধরে উপবাস পালন করেন (উদাহরণস্বরূপ ধর্মীয় উপবাস/Ramadan বা স্বেচ্ছায় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং), তাদের একই পরিবেশে থাকা সমবয়সী অনিয়মিত উপবাসকারীদের তুলনায় মৃত্যু ঝুঁকি প্রায় ৫০% কম ছিল, অর্থাৎ নিয়মিত উপবাসের অভ্যাস সম্ভাব্যভাবে মানুষের সুস্থ আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি এবং বয়সঘটিত রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস
রোজার মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়, একইসাথে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে:
- ইমিউন সিস্টেম পুনর্গঠন: দীর্ঘ সময় (৪৮-৭২ ঘণ্টা) ধরে উপবাস রাখলে শরীর শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে পুরনো ও অকার্যকর শ্বেত রক্তকণিকাসহ ইমিউন কোষগুলোকে অপসারণ করে ফেলে। উপবাসকালীন একটি বিশেষ জিন (PKA) নিষ্ক্রিয় হওয়ার ফলে স্টেম সেলগুলি সক্রিয় হয়ে নতুন ইমিউন কোষ (শ্বেত রক্তকণিকা) উৎপাদন শুরু করে। ফলে উপবাস শেষ হলে শরীর একটি “নতুন” ইমিউন সিস্টেম পায়, যা সংক্রমণ ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
- প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ: উপবাস শরীরে অতিরিক্ত প্রদাহ (ইনফ্লামেশন) কমায় এবং ইনসুলিনের প্রতি দেহকোষের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে। এর মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা ভালভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় ও ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বিপাকীয় (metabolic) রোগের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে উপবাস থাকাকালীন দেহে প্রদাহজনিত কিছু সংকেত কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি ডায়াবেটিস ও স্থূলতার গতিকে শ্লথ করতে পারে।
- হৃদরোগ ঝুঁকি হ্রাস: নিয়মিত রোজা রাখার ফলে রক্তের লিপিড প্রোফাইল উন্নত হয় অর্থাৎ উপকারী কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমে। পাশাপাশি রক্তচাপও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক, কারণ উচ্চ কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ এথেরোস্ক্লেরোসিস (ধমনীতে চর্বি জমে আঁটসাঁট হওয়া) এবং করোনারি হৃদরোগের প্রধান কারণ। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে উপবাস ধমনীতে চর্বি জমার প্রবণতা কমায় এবং হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ হ্রাস করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
- ক্যান্সার ও টিউমার প্রতিরোধ: উপবাস অবস্থায় কোষে বৃদ্ধি促ক হরমোন যেমন IGF-1 এর মাত্রা কমে যায় এবং কোষগুলো “মেরামত মোডে” চলে যায়। এর ফলে অস্বাভাবিক কোষবৃদ্ধি ও টিউমার তৈরির সম্ভাবনা কমে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে যে নিয়মিত উপবাস প্রাণীদেহে ক্যান্সারের হার কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং কেমোথেরাপির সাথে সমন্বয় করে দিলে চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উপবাস কোষের সার্টুইন পথকে সক্রিয় করে, যা কোষকে ক্ষতিকারক পরিবর্তন থেকে রক্ষা করে এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ধীর করে। তাই রোজা পালন সম্ভাব্যভাবে দেহকে কিছু ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

৬. হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য
রোজা রাখার সময় দেহে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন ও বিপাকীয় (মেটাবলিক) পরিবর্তন ঘটে, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। উপবাসের ফলে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায় এবং ইনসুলিনের প্রতি কোষের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়, ফলে শরীর জমাকৃত চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহারে বেশি সক্ষম হয়।
একেই বলে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ানো, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া উপবাসকালীন মানব বৃদ্ধিহরমোন (HGH) এর মাত্রাও লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে ২৪-৪৮ ঘণ্টার উপবাসের পর রক্তে HGH এর মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে।
এই বৃদ্ধিহরমোন পেশী প্রোটিন ক্ষয় কমায় এবং চর্বি বিপাক বাড়ায়, যার ফলে মাংসপেশি রক্ষা পেয়ে ওজন কমানো সহজ হয়। রোজার আরও একটি সূক্ষ্ম প্রভাব হলো ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। উপবাস থাকা অবস্থায় ক্ষুধা লাগার অনুভূতি促ক হরমোন ঘ্রেলিন ধীরে ধীরে সাময়িকভাবে হ্রাস পেতে থাকে এবং পেট ভরা থাকার সংকেতদাতা লেপটিন হরমোনের প্রতি দেহের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষুধা-নিয়ন্ত্রণের উন্নতি ঘটে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমে। রাতে ঘুমের সময় কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) মাত্রাও রোজার কারণে কিছুটা কমে আসে বলে জানা গেছে, যা অতিরিক্ত চাপজনিত কোষ ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। সারসংক্ষেপে, রোজা শরীরের হরমোনগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যকর সামঞ্জস্য বজায় রেখে মোটাবলিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।
৭. কম পরিচিত গবেষণা ও নতুন আবিষ্কার

উপরের চিত্রে এক মাস ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (রমজানের অনুরূপ) উপবাসের পর মানুষের রক্তের প্রোটোম বিশ্লেষণের ফলাফল দেখানো হয়েছে। এতে দেখা যায় যে উপবাসের ফলে শরীরে অ্যান্টিক্যান্সার প্রোটিন, সার্কাডিয়ান ক্লকের সাথে সম্পর্কিত প্রোটিন, DNA মেরামত এনজাইম, ইনসুলিন ও বিপাক নিয়ন্ত্রণকারী প্রোটিন, সাইটোস্কেলেটন (কোষের কাঠামো) পুনর্গঠনকারী প্রোটিন, ইমিউন সিস্টেমের প্রোটিন এবং মস্তিষ্ক ও মানসিক কার্যক্রম উন্নতকারী প্রোটিনসমূহের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় রোজার এমন বহু ইতিবাচক জৈবরাসায়নিক পরিবর্তনের প্রমাণ মিলছে। নিচে উপবাস সংক্রান্ত কয়েকটি নতুন ও চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- গাট মাইক্রোবায়োম ও দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক: টানা কয়েকদিন উপবাস রাখলে আমাদের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। একটি গবেষণায় ৫ দিন ধরে পর্যায়ক্রমিক উপবাসের পরে মানুষের অন্ত্রে Christensenella প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে দেখা গেছে। এই ব্যাকটেরিয়াটি দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত (centenarianদের অন্ত্রে বেশি পাওয়া যায়) এবং উপবাসের ফলে এর বৃদ্ধি বার্ধক্য প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। একই গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে উপবাসের পরে শরীরে SIRT1 ও SIRT3 এর মতো দীর্ঘায়ু-সংশ্লিষ্ট জিনের অভিব্যক্তি (এক্সপ্রেশন) বেড়েছে। অর্থাৎ রোজা একই সাথে গাট মাইক্রোবায়োম এবং জিনগত পর্যায়ে পরিবর্তন এনে স্বাস্থ্যবান বার্ধক্য促ক পরিবেশ তৈরি করে।
- ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় কোষ পুনর্জন্ম: সম্প্রতি এক গবেষণায় ফাস্টিং-মিমিকিং ডায়েট (অর্থাৎ উপবাস সদৃশ কম-ক্যালোরির খাদ্যচক্র) প্রয়োগ করে টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ইঁদুরের অগ্ন্যাশয়ে উল্লেখযোগ্য পুনর্জন্ম ঘটানো সম্ভব হয়েছে। উপবাসের কারণে অগ্ন্যাশয়ের অকেজো কোষগুলো পুনরায় কার্যকর ইনসুলিন উৎপাদনকারী বেটা কোষে রূপান্তরিত হয়েছে। বিজ্ঞানী ভ্যালটার লংগো এবং তার সহযোগীরা জানান, এই ডায়েট চক্রের মাধ্যমে “অজানা কোষগুলোকে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষে পুনঃপ্রোগ্রাম করা গেছে” এবং এর ফলে শেষ পর্যায়ের ডায়াবেটিস থেকেও ইঁদুরগুলোকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ উপবাসের ধরনের থেরাপি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পুনর্গঠনের এক নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
- অটোইমিউন ও প্রদাহজনিত রোগের ক্ষেত্রে উপবাস: আমাদের ইমিউন সিস্টেম যখন নিজের শরীরের ضدেই অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাকে অটোইমিউন রোগ বলে (যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস ইত্যাদি)। সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা গবেষণায় জানা গেছে যে অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস এই ধরনের অটোইমিউন রোগের উপসর্গ হ্রাসে সাহায্য করতে পারে। উপবাসের ফলে শরীরে প্রদাহসূচক চিহ্ন (inflammatory markers) কমে, ইমিউন সেলগুলোর কার্যক্রম ভারসাম্যমূলক হয় এবং কোষীয় অটোফ্যাজির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত উপাদান দূর হয়। বিশেষত, উপবাস অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের গঠন পরিবর্তন করে যা ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত রাখতে সহায়তা করে। যদিও এখনো এই ক্ষেত্রের গবেষণা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, প্রাথমিক ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয় যে সঠিক নিয়ম মেনে উপবাস পালন অনেক অটোইমিউন রোগের ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।
উপসংহার
সমগ্রভাবে বিচার করলে, রমজানের রোজার মতো উপবাস প্রথা শরীরে বহুমুখী স্বাস্থ্য উপকারণা এনে দিতে পারে। কোষীয় পুনর্গঠন থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি, জিনের সদর্থক পরিবর্তন, বার্ধক্য প্রতিরোধ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও হরমোনগত ভারসাম্য — এসব ক্ষেত্রেই উপবাসের ইতিবাচক প্রভাব বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন। অবশ্য বেশ কিছু গবেষণা এখনো প্রাণী বা ক্ষুদ্র-মানের মানবঅধ্যয়নের উপর ভিত্তি করে, তাই এসব ফলাফলকে আরও বৃহত্তর মানবজনিত গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রোজার উপকারিতাগুলো সর্বোত্তমভাবে পেতে হলে সঠিক পদ্ধতিতে এবং ব্যক্তি বিশেষে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে উপবাস পালন করা উচিত। তবে দিনে দিনে জমে ওঠা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে সিয়াম সাধনা শুধুই আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়, বরং এটি সুস্বাস্থ্যের জন্য একটি শক্তিশালী আধুনিক পদ্ধতিও বটে।
