লেখক: মোহাম্মদ ইকবাল
সম্পাদক, খবর কেন্দ্র
২ মার্চ, ২০২৫

ছবিতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ইউরোপের সন্ধিক্ষণ এবং ইউক্রেনের সংগ্রামের প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বৈঠক শুধু ওয়াশিংটন এবং কিয়েভের মধ্যে নয়, বরং সমগ্র ইউরোপে একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। বৈঠকের সময় ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইউক্রেন যদি শিগগিরই রাশিয়ার সাথে সমঝোতায় না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তার সমর্থন কমিয়ে আনবে। তিনি বলেন, “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোনোর ঝুঁকি ইউক্রেন নিচ্ছে, কিন্তু তাদের হাতে কোনো কার্যকর কার্ড নেই।” এই বক্তব্য শুধু ইউক্রেন নয়, সমগ্র ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইউরোপীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া: সমর্থন নাকি সংশয়?
ট্রাম্পের এই অবস্থানের পর ইউরোপীয় নেতারা ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অধিকাংশ নেতা ইউক্রেনের প্রতি তাদের অটল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু কিছু রাষ্ট্র প্রধান এখন শান্তি আলোচনার গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, “এই যুদ্ধ রাশিয়ার আগ্রাসনের ফল। ইউক্রেন শুধু তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছে, এবং আমরা তাদের পাশে থাকবো।”
জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা কমিয়েও দেয়, ইউরোপ একা দাঁড়িয়ে থাকবে এবং ইউক্রেনের পাশে থাকবে। কিন্তু এর জন্য আমাদের নিজস্ব সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল তৈরি করতে হবে।”
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে মতভেদও দেখা দিয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওর্বান আবার বলছেন, “আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবো না। এখন সময় এসেছে রাশিয়ার সাথে একটি শান্তিচুক্তির কথা ভাবার।”

প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টার্মার এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর, উভয় নেতা একসঙ্গে বেরিয়ে আসেন। এই মুহূর্তটি জেমস ম্যানিং/পিএ দ্বারা ধারণ করা হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের অবস্থান: কৌশলগত পরিবর্তন?
যুক্তরাজ্য এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রতি অটল সমর্থন প্রদর্শন করেছে। কিন্তু ট্রাম্প-জেলেনস্কির বৈঠকের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে।
স্টার্মার বলেন, “আমরা ইউক্রেনকে ছেড়ে দেব না। তবে আমাদের প্রতিরক্ষা নীতির বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে এবং অন্যান্য ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে একত্রে কাজ করতে হবে।”
যুক্তরাজ্য বর্তমানে নতুন সামরিক বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এবং ইউক্রেনকে সরাসরি সমর্থন করার জন্য বিশেষ সামরিক ইউনিট প্রস্তুত করছে। তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে যুক্তরাজ্য যদি একা লড়াই চালিয়ে যায়, তাহলে এটি তাদের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে।
এই যুদ্ধ কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে?
বিশ্ব রাজনীতিবিদরা এবং বিশেষজ্ঞরা এখন আলোচনা করছেন যে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে যেতে পারে কি না। যদি ইউরোপ এবং ন্যাটো সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটি বিশ্বব্যাপী একটি বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ইউক্রেন থেকে সরে আসে, এবং ইউরোপ এককভাবে যুদ্ধ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে রাশিয়া কৌশলগতভাবে আরও আগ্রাসী হতে পারে। এটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পরমাণু সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলতে পারে।”
যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়, কে জিতবে?
বিশ্বব্যাপী সামরিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- সামরিক শক্তি: রাশিয়ার পরমাণু শক্তি এবং সামরিক শক্তি বিশাল, তবে ন্যাটোও অত্যন্ত শক্তিশালী।
- অর্থনৈতিক শক্তি: ইউরোপ এবং আমেরিকা একত্রিত হয়ে রাশিয়ার অর্থনীতিকে নিষ্পেষিত করতে পারে। রাশিয়া যদি চীনের সম্পূর্ণ সমর্থন না পায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে।
- মিত্রশক্তির ভূমিকা: চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, এবং অন্যান্য দেশ কোন পক্ষ নেবে, তা বড় ভূমিকা রাখবে। চীন যদি রাশিয়াকে সমর্থন করে তবে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এটি চরম বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশ্বের ভবিষ্যৎ: যদি বিশ্বযুদ্ধ ঘটে?
যদি এই যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করে, তাহলে বিশ্বের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
- জ্বালানি সংকট: রাশিয়ার তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে।
- খাদ্য সংকট: ইউক্রেন এবং রাশিয়া দুটোই প্রধান খাদ্য সরবরাহকারী দেশ। যুদ্ধের কারণে খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে।
- পরমাণু যুদ্ধের হুমকি: সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার, যা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
- প্রযুক্তি ও সাইবার যুদ্ধ: যদি বিশ্বযুদ্ধ হয়, তাহলে সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধও ব্যাপক মাত্রায় দেখা যাবে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, এবং সরকার পরিচালনায় সাইবার হামলা চালানো হতে পারে।
এই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ কি যুদ্ধ চালিয়ে যাবে নাকি শান্তি আলোচনার দিকে যাবে? যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাই বা কী হবে? এটি স্পষ্ট নয়, তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—বিশ্বের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। যদি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তবে এটি মানব সভ্যতার জন্য এক চরম পরীক্ষা হবে, যেখানে পরমাণু যুদ্ধ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক পতন পর্যন্ত সবকিছুই সম্ভব।
