দুই শয়নকক্ষের ফ্ল্যাটে ২৩ জনের বসবাস, ভাড়াটিয়া দম্পতির £৯০,০০০ জরিমানা
অনলাইন ডেস্ক

লন্ডনের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা শ্যাডওয়েলে ২০২৩ সালের ৫ মার্চ ভোরে ঘটে এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড, যার ফলে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ৪১ বছর বয়সী মিজানুর রহমানের। ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি ত্রুটিপূর্ণ ই-বাইকের ব্যাটারি থেকে, যা চার্জে থাকা অবস্থায় আগুন ধরে যায়। তবে তদন্তে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই অগ্নিকাণ্ড শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং অবৈধ আবাসন ব্যবস্থার চরম অবহেলার ফলাফল।
ফ্ল্যাটটি ছিল মাত্র দুটি শয়নকক্ষ বিশিষ্ট, যেখানে আইনত তিনজন থাকার অনুমতি ছিল, কিন্তু বাস্তবে সেখানে ২৩ জন মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করছিলেন। এই অবৈধভাবে বসবাসের দায়ে আদালত ভাড়াটিয়া দম্পতি সোফিনা বেগম (৫২) ও আমিনুর রহমান (৫৫)-কে £৯২,০৫০.০১ জরিমানা করেছে, যা আবাসন আইন লঙ্ঘনের এক নজিরবিহীন শাস্তি বলে মনে করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ভয়াবহতা
লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের তদন্তে জানা গেছে, আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ত্রুটির কারণে, যা চার্জে থাকাকালীন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আর দমকল বাহিনী পৌঁছানোর আগেই পুরো ফ্ল্যাটটিতে ধোঁয়া ও আগুনে বিপর্যয় নেমে আসে।
ঘটনার সময় ফ্ল্যাটটিতে ১৮টি বিছানা ছিল, যেখানে কেউ কেউ বাঙ্ক বেড ভাগ করে ঘুমাতেন, আবার অনেকেই মেঝেতে শুয়েথাকতেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই মারাত্মক ছিল যে, কিছু বাসিন্দা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
অবৈধ আবাসন: ২৩ জনের ঠাসাঠাসি বাসস্থান
ফ্ল্যাটটির মূল অনুমোদন ছিল মাত্র তিনজনের বসবাসের জন্য, কিন্তু অবৈধভাবে সেখানে ২৩ জনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আইনজীবী গেমা গিলেট আদালতে বলেন:
- “এই ফ্ল্যাটটি বহুদিন ধরেই ভয়ানকভাবে গাদাগাদি ছিল। সেখানে ২৩ জন মানুষ বসবাস করছিলেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
- “ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা যেন ঠিকানাটি সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহার না করতে পারেন, সে জন্য তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল, যাতে বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়।”
- “এই বাসিন্দাদের প্রতিজনকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় £৯০ ভাড়া দিতে হতো, যা বাড়ির মালিকদের জন্য বিশাল আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করেছিল।”
আদালতের রায় ও শাস্তি
এই ঘটনায় দম্পতিকে আবাসন আইন লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করা হয় এবং তারা ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে দোষ স্বীকার করেন।
আজ পূর্ব লন্ডনের স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউন কোর্টে বিচারক এমা স্মিথ দম্পতির বিরুদ্ধে কঠোর রায় দেন:
- সোফিনা বেগমকে £১০,০০০ জরিমানা, £২,০০০ প্রসিকিউশন খরচ এবং £৭৮,০৪৯ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।
- আমিনুর রহমান, যিনি আদালতে দাবি করেন যে তিনি “অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অসচ্ছল”, তাকে £২,০০০ জরিমানা এবং মাত্র £১.০১ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিচারক এমা স্মিথ দম্পতিকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বলেন, “তোমরা দুজন সমানভাবে এই অপরাধে জড়িত ছিলে এবং আর্থিক সুবিধা নিয়েছো। তোমরা আইন এবং বাসিন্দাদের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলে।”
প্রতারণা ও দায় স্বীকার
আদালতে দাখিল করা নথিতে উঠে আসে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—আগুন লাগার এক মাস পর, সোফিনা বেগম ফ্ল্যাটের জন্য নির্মাণ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন, কিন্তু তিনি সেখানে আগুন লাগার ঘটনাটি গোপন করেন। বরং, তিনি শুধুমাত্র লিখেছিলেন যে, “ফ্ল্যাটটি অত্যন্ত গাদাগাদি”। এই তথ্য আদালতে উপস্থাপন হলে বিচারক আরও কঠোর মন্তব্য করেন:
- “এই ঘটনা অভিযুক্ত অপরাধগুলোর পরেও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।”
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের প্রতিক্রিয়া
টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন:
- “কিছু বাড়িওয়ালা এখনো ভাড়াটিয়াদের শোষণ করছে, নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন করছে, এবং মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে—এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
- “আমাদের ভাবনা ও প্রার্থনা মিজানুর রহমানের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে রয়েছে, যিনি এই মর্মান্তিক আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন। আমরা এমন অপরাধী বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
- “এই মামলার রায় একটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে—আমরা লোভী, অপরাধী বাড়িওয়ালাদের সহ্য করবো না। আমাদের সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ চালিয়ে যাবো।”
তিনি আরও বলেন, সরকারকে জাতীয় পর্যায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ স্বাগত জানানো হয়েছে।
এই ঘটনার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
এই রায় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যুক্তরাজ্যের আবাসন আইন লঙ্ঘন করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এটি শুধু অবৈধ আবাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নয়, বরং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সরকারের শক্ত অবস্থানের একটি উদাহরণ।
স্থানীয় প্রশাসন এখন থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনাগুলো প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে।
এই প্রতিবেদন বিবিসি, টিভি৩ বাংলা এবং অন্যান্য বিশ্বস্ত সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
