স্টাফ রিপোর্টার। লন্ডন
১১ মার্চ ২০২৫

সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানিয়েছে ইউক্রেন। মঙ্গলবার (১১ মার্চ ২০২৫) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন এবং বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে ইউক্রেনের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়ালৎস, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিগা এবং প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের চিফ অব স্টাফ আন্দ্রে ইয়েরমাক উপস্থিত ছিলেন। যদিও বৈঠকে রাশিয়ার কোনো প্রতিনিধি অংশ নেয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই রাশিয়ার সঙ্গে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত এই যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী, উভয় পক্ষ ৩০ দিনের জন্য সকল সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রাখবে। এই সময়ের মধ্যে আকাশ হামলা, স্থল অভিযান, নৌ অবরোধসহ যেকোনো সামরিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত থাকবে। একইসঙ্গে, উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তিচুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইউক্রেন এই যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত এবং এখন এটি কার্যকর করতে রাশিয়ার সম্মতি প্রয়োজন। যুদ্ধের অবসান ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
যুদ্ধবিরতির এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য পুনরায় সামরিক সহায়তা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক সহায়তা বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা এই নতুন চুক্তির মাধ্যমে পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে, ড্রোন নজরদারি, স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ বাড়ানো হবে বলে জানা গেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই যুদ্ধবিরতিকে একটি “সুবর্ণ সুযোগ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, “আমরা শান্তি চাই, কিন্তু তা হতে হবে আমাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে। এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে রাশিয়ার সত্যিকারের অভিপ্রায় প্রকাশ পাবে।”
এদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, মস্কো যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, তবে এটি তাদের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে কিনা, সেটিও বিবেচনা করা হবে।
বিশ্ব সম্প্রদায় এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, চীন, এবং তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই যুদ্ধবিরতির সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, “এই যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে এটি রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের জন্যই কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারে। একদিকে, ইউক্রেন তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনরায় সংগঠিত করার সুযোগ পাবে, অন্যদিকে, রাশিয়া যদি এই চুক্তিকে মেনে নেয়, তাহলে তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে চাপ দিতে পারে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আশাবাদী হলেও তিনি জানিয়েছেন, “শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি, এখন রাশিয়ার পালা।”
এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ার ওপর। যদি মস্কো এটি গ্রহণ করে, তবে ইউক্রেন যুদ্ধের একটি নতুন মোড় নিতে পারে। কিন্তু যদি তারা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এই কূটনৈতিক আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
