লন্ডন, আগস্ট ২০২৫
প্রতিবেদন: মোহাম্মদ ইকবাল

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দাঙ্গা, বিক্ষোভ ও সামাজিক বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি গৃহযুদ্ধ বা অন্তত ব্যাপক সহিংস সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। সরকারও স্বীকার করছে, দেশের সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে এবং একে পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা
কিংস কলেজ লন্ডনের আধুনিক যুদ্ধবিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড জে. বেটজ সম্প্রতি এক প্রবন্ধে যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয় বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ কমছে, আর সমাজ ভেঙে পড়ছে নানা বিভাজনের কারণে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন—
“আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শহরগুলো ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে, যাকে আমি বলি ‘feral cities’—যেখানে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে, দাঙ্গা ও অপরাধ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতি শহর ও গ্রামের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ ডেকে আনতে পারে।”
বেটজ হিসেব কষে দেখিয়েছেন, যেকোনো একটি দেশে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা হয়তো ১৮–২০ শতাংশের মতো, কিন্তু একই সময়ে একাধিক দেশে যদি এই চাপ তৈরি হয় তবে সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, পশ্চিমা নগর কেন্দ্রগুলো ক্রমেই বহুসাংস্কৃতিক হলেও গ্রামীণ এলাকা তুলনামূলকভাবে সমজাতীয় থেকে যাচ্ছে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনকে তীব্র করছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক
এই সতর্কবার্তার পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। রিফর্ম ইউকে দলের নেতা নাইজেল ফারাজ বলেছেন, “যদি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে ব্রিটেন শিগগিরই ভয়াবহ গণঅশান্তির মুখোমুখি হবে।” তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, গত বছরের সাউথপোর্ট দাঙ্গা কিংবা এ বছরের বালিমিনার ঘটনা প্রমাণ করছে সমাজে ক্ষোভ জমছে।
ফারাজের অভিযোগ, সরকারের অভিবাসন নীতি ব্যর্থ হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে অবহেলা করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “মানুষ যখন অনুভব করে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে না, তখন রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। সেই প্রতিবাদ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা দাঙ্গা, এমনকি গৃহযুদ্ধেও রূপ নিতে পারে।”

সরকারের অবস্থান
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ বিষয়ে আরও সংযত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সমাজের সামাজিক বন্ধন মেরামত করা। যদি আমরা জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি হবেই।”
সরকার ইতোমধ্যে স্থানীয় কাউন্সিল, কমিউনিটি সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করছে, যাতে গুজব ও ঘৃণাভাষণ ঠেকানো যায়। তবুও সরকারের ভেতরে স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, ২০২৪ সালের মতো সহিংস দাঙ্গা আবার ঘটতে পারে যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে সাউথপোর্টে এক কিশোরীর হত্যাকাণ্ডের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ভুলভাবে ধরে নেয় অপরাধী একজন অভিবাসী। এর জেরে কয়েক দিনের মধ্যে লন্ডন, বার্মিংহামসহ নানা শহরে অভিবাসীবিরোধী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকশ’ মানুষ আহত হয়।
পুলিশকে টানা কয়েক রাত অতিরিক্ত বাহিনী নামাতে হয় এবং এক হাজার আটশ’ এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরকার এটিকে “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বড় শহুরে সহিংসতা” হিসেবে বর্ণনা করে।
এ বছর (২০২৫) জুলাইয়েও আবারো অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়, যার সঙ্গে যুক্ত হয় পাল্টা বিক্ষোভ। ফলে কিছু এলাকায় অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল “আইসবার্গের চূড়া”—গভীরে ক্ষোভ আরও বড় আকারে জমছে।
সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা
গবেষকরা বলছেন, অনলাইন ঘৃণাচক্র এবং উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলো এই দাঙ্গায় বড় ভূমিকা রাখছে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া ছবি ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা রাস্তায় সহিংসতায় রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ডিজিটাল প্রচারণা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতের সহিংসতা ঠেকানো কঠিন হবে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
এই বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৬৮ সালে কনজারভেটিভ নেতা এনক পাওয়েল তাঁর কুখ্যাত “Rivers of Blood” বক্তৃতায় অভিবাসন ইস্যুতে ব্রিটেনে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। যদিও সেটি তীব্র সমালোচিত হয়েছিল, তবুও কয়েক দশক পর আবারো একই শব্দচিত্র সামনে আসছে—যা দেখায় সমাজে এই উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।
যুক্তরাজ্যে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ এখনো কেবল একটি সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা মাত্র। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা, সামাজিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সমস্যা যদি সমাধান না হয়, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে আস্থা ফিরিয়ে আনা, অভিবাসীদের সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং ঘৃণাভাষণ নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
