মুহাম্মদ ইকবাল

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের আত্মপ্রকাশ: নতুন ছাত্র আন্দোলনের সূচনা
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ’। বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ২০৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সাত কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ও উদ্দেশ্য
সংগঠনের আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার জানান, নতুন এই ছাত্রসংগঠনটি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে দূরে থেকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কাজ করবে। তিনি বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল সংগঠন গড়ে তুলতে চাই। আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করা।”
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব জাহিদ আহসান বলেন, “আমরা ছাত্র রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করতে চাই। এখানে বয়সসীমা ২৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিগুলোতে ভর্তি হওয়ার সাত বছরের মধ্যে নেতৃত্বের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি নারীদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।”
কমিটি গঠন ও সদস্যপদ বিতর্ক
সংগঠনের ঘোষণার আগের দিন, বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) মধুর ক্যান্টিনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা অভিযোগ করেন যে, তাদের প্রতিনিধিত্ব যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে তারা বিক্ষোভ শুরু করে, যা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঘটনার পর সংগঠনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রধান করা হয়েছে মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদাসসির চৌধুরীকে।
সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, তদন্ত কমিটি সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিফাত রশীদের পদত্যাগ ও নতুন মনোনয়ন
সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত রশীদকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব পদে মনোনীত করা হয়েছিল। তবে কমিটি ঘোষণার পরপরই তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “এই কমিটিতে আমার নাম ঘোষণা করার আগে আমার সম্মতি নেওয়া হয়নি। দফায় দফায় আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে আমি পদত্যাগ করছি।”
রিফাত রশীদের পদত্যাগের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল মাশনূনকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে এবং ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম আবেদীনকে সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সংগঠক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। সংগঠনের মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদাসসির বলেন, “আমরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের সংগঠনের ইউনিটভিত্তিক কমিটি প্রস্তুত করব। এটি আহ্বায়ক কমিটি, যা পরবর্তী কাউন্সিলের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। আমাদের লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা এবং ছাত্রদের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।”
সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদ সিয়াম বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করব, যেমন—সেশনজট দূরীকরণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণে ভর্তুকি প্রদান এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”
সংগঠন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া
নতুন ছাত্রসংগঠনের আত্মপ্রকাশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমরা চাই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন, যারা শুধু রাজনৈতিক দলের স্বার্থ নয়, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে।”
অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফিদা ইসলাম বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি অতীতে অবহেলা করা হয়েছে। আমরা আশা করি, এই সংগঠন সব শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষায় কাজ করবে।”
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের আত্মপ্রকাশ দেশের ছাত্ররাজনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনটি যদি সত্যিই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে মুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করতে পারে, তাহলে এটি শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক চেতনার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে সংগঠনটি তার ঘোষিত লক্ষ্যে কতটা সফল হতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।
